3 July 2015

A STORY OF GREED AND TEMPTATION




''কম পোজা বেশি ধন ''



A . B . C = আব্দুল বাতেন চৌধুরী

সন আমার সঠিক মনে নাই ;   কবে থেকে ওনাকে চিনি - সেই ছোট বেলার অনেক স্মৃতি বিজড়িত এক জন মানুষ আমাদের পরিবারের  সদস্য এর মত আমাদের প্রিয় বাতেন কাকা। 
১৯৬৬ সালে আমার বয়স পাচ ছয় বছর থকন থেকেই এই নামটার আমার পরিচয়; বাবার সরকারী আর্দালি ; বাতেন কাকা ; আমাদের সবার প্রিয় বাতেন কাকা। 
কুমিল্লা জেলার নবীনগর থানার এক গ্রামে ওনার জন্ম ; ১৯৫৮ সাল থেকেই উনি আমার পিতার সাথে চাকরি করে আসছেন; সকালে চানখার পুলে পেডেল মেরে সাইকেল চালিয়ে লাইন থেকে চলে আসতেন কিবা শীত ,কি বা বৃষ্টি - মীরের ময়দান কোথায়  আখালিয়া ইপিআর কেম্পের ডেইরি ফার্ম  - অনেক দুরের রাস্তা ; সেই কাকডাকা ভোরে চলে আসতেন আমাদের সবার প্রিয় বাতেন কাকা। 
আব্বা অফিস চলে গেলে উনি বাজার করতেন; অথবা  আমাদের মাঝে মাঝে রিক্সা করে সিলেট দরগার মাদ্রাসায় নিয়ে যেতেন  -ফক্ফকে দিন হলে আমরা তিন ভাই ওনার সাথে হেটে হেটেই দরগায় পৌছে যেতাম ওনার আজগুবি সব গল্প গুলো শুনতে শুনতে ; একটা মুদ্রা দোষ হলো ; কথায় কথায় বলতেন  ''বুজছেন নি কথাটা জি'' - আমাদেরকে ভীষণ স্নেহ করতেন উনি; 
তারপর আমরা ইস্কুলে যেতাম উনি ততক্ষণে আবার সাইকেল মেরে চলে যেতেন লাইন এ বা বেরাকে ; ঐ আমলে কেম্প অথবা বেড়াক ই বলতেন ইপিআর উইং গুলোকে। 
হঠাত আব্বা চলে যেতেন বর্ডারএ বাবার সাথে বাতেন কাকাও গায়েব হয়ে যেত ; দেখাগেলো  এক  রবিবারে দুপুরে যখন বাসার সবাই গুমাচ্ছে দরজায় মৃদু খটখট আওয়াজ ; আমরা ভাইবোনরা তখন হয়ত ভীষণ  মনোযোগ দিয়ে বসে বসে রেডিওতে রবি ঠাকুরের ডাক হরকরা নাটিকা অথবা খোকা বাবুর প্রত্যাবর্তন শুনছি - দরজা কে খুলতে যাবে তা নিয়ে সবার ই উন্নাসিকতা ; আমার কপালেই পরতো দরজা খুলার দায়িত্বটা ; খোলার আগে জিগ্গেস করতাম ''কে ?'' ওপাশ থেকে গুরুঘম্ভির গলায় উত্তর '' আমি abc ; আব্দুল বাতেন চৌধুরী।''
এক গাদা মিষ্টি, নাশপাতি, কমলা লেবু এক ঝুরি এবং হরেক রকমের লজেন্স নিয়ে হাজির আমাদের সবার অত্যন্ত প্রিয় বাতেন কাকা। ''বুজছেন নি কথাটা জি'' - এই নেন তোমাদের জন্য এই সব ; কালকে সকালে আবার আসব এখন মেটিনি শো দেখতে যাব; ভীষণ সিনেমা পাগল এই ভদ্র লোক । আর সিনেমা দেখে এসে উনার বলতেই হবে আমাদেরকে সেই সিনেমার গল্প টা , না শুনলে খুব মাইন্ড করতেন উনি। 
আমরা সবাই উনার সাথে হাটতে যেতাম বিকেল বেলা - নতুন মেডিকেল কলেজ পার হয়ে ছড়ার ওপর পাড় দিয়ে হেটে হেটে সেই কসাই খানা পর্যন্ত এবং বেক। অনেক দূর মনে হত সেই পথ ; চলতে চলতে অনর্গল গল্প বলেই যেতেন ওনার গল্পের আর শেষ হত না। দারুন নলেজ রাখতেন সব বিষয়ে - ওই ছোট কালেই মনে হতো উনি অত্যন্ত খুবই পড়াশুনা করতেন -  হিটলার- হিমলার থেকে শুরু করে নেপোলিয়ান থেকে সিকান্দার বাদশা ( আলেকজান্ডার) ওনার  কোনো কিছুই অজানা ছিল না। উর্দু - পাঞ্জাবি এবং পুষ্তু  ভাষা বলতে পারতেন অনর্গল।  পাক ভারত উপ মহাদেশের ইতিহাস তো একেবারে পান্তা ভাত।  

একদিন  ওনার বদলি হয়ে গেল ফোর উইং ইপিআর এ সেই - আমরা খুব মনক্ষুন্ন হলাম ওনাকে বিদায় দিতে। আব্বা বললেন সরকারী চাকরি তে যেতেই হবে - আমি বাবা কি ভাবে ঠেকাবো অর বদলি - আমার এখতিয়ারের বাইরে। সবাই কে ফেলে একদিন উনি চলে গেলেন সেই সিলেট থেকে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে। আমরা হারালাম একজন গল্প বলার সাথী এবং আমাদের সকল আব্দারের মিডেল মেন কে। 
ইত্তিমধ্যে আমরা সিলেট থেকে চলে এসেছি বি বাড়িয়া তে - মা একটা ইস্কুলে চাকরি নিয়ে - অনেক দিন পর কাস্টমস এর চাকরিটা ছাড়ার কয়েক কি সব ডিগ্রী ঠিগ্রী নিয়ে তার পর এই নতুন চাকরি - নতুন জায়গা, ভিন্ন ধরনের ভাষা- ''শৈলডা ভালা নি'' - হেতায়ন - খ কে হ আর হ কে খ উচ্চারণ শুনতে কান ঝালাপালা - এ আবার কোন ধরনের ভাষা।  ঐতিহাসিক ভাবে আমাদের আদি বাড়িও  কসবার এক সুন্দর নদীর পাড়ের  গ্রাম গোপিনাথ পুরে   এবং আরো নতুন নতুন একসেন্ট এর সাথে আমাদের পরিচয় ঘটলো এখানে আসার পর। 

এদিকে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করলো - বাতেন কাকা এসে হাজির এক দিন কি বেপার আপনি? আর বলিয়েন না - কি যে বলল বুজলাম না কিছুই - সাক্ষী দিতে যেতে হবে সিলেট এ তাই যাওয়ার পথে ওনার গ্রামের বাড়িতে কয়েক দিন বেড়াবে আর ওই ফাকে আমাদের কেও দেখে গেলেন।  

এই সব ঘনঘটার মাঝে উনি সিলেট থাকা অবস্থায় সাধীনতা যুদ্ধ বেধে গেল। সোজা গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন এই ভেবে যাত্রা শুরুও করলেন। ... সিলেট থেকে হেটে , রিকশায় , নৌকায়, ট্রাকে করে শ্রীমঙ্গল পৌছে দেখা পেলেন আব্বার দলের সাথে - ২৬ শে মার্চ সকালেই   আব্বা শমশের নগর বিমান বন্দর থেকে বিদ্রোহি দের দল এ যোগ দেন - শ্রীমঙ্গল এবং মৌলভীবাজার এর ট্রেজারী (তেরজুরি) থেকে সব টাকা করি বিভিন্ন টি গার্ডেনের ট্রাকে এবং আব্বার ইপিআরের একটা তিন  বেডফোর্ড উচা ট্রাক  ও একটা শেভ্রেলে পিক আপ এ উঠিয়ে নিয়ে চাতলা পুর নামক এক বি ও পি তে কেম্প করা হলো। ইতিমধ্যে ওখানকার নেতা কমান্ডার মানিক চৌধুরী এবং অনান্য রা কৈলাশ শহরের ভারতীয় দের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করলেন কিন্তু আব্বার তত্ত্বাবধানে ঐ কেম্পে ওই গাড়ী গুলোতে থাকলো সব টাকা গুলো- স্বর্ণ এবং ট্রেজারীর বাকি সব মালামাল। 
সকলের চাইতে বিশস্থ সিপাহী আব্দুল বাতেন চৌধুরী আব্বা দায়িত্ব দিলেন ওই সকল গাড়ি গুলোর গার্ড কমান্ডার হিসেবে। রাতেও উনি ঘুমান ঐসব একটা ট্রাকের উপরে তেরপালের ভিতর - চতুর দিকে মুজাহিদ এবং আনসার
( কমান্ডার মানিক চৌধুরীর লোকজন) - 

সকলের অজান্তে গভীর রাতে বাতেন চৌধুরী টর্চ এর সাহায্যে চুপি চুপি টাকার বস্তা থেকে টাকার বান্ডেল বান্ডেল দেখে উনার পেক জিরো এইট এবং কিট বেগ ( তাও আবার ই পি আরের পাঞ্জাবিদের থেকে নেওয়া এই সব বর্দী ও এফ এস এম ও ) - সব গুলো ঠাশিয়ে ভর্তি করে রাতের আধারে - বিওপির পেছেনে একটা ছোট মাজার জাতীয় এক জায়গায় একা একাই সব গর্ত খুরে লুকিয়ে ফেলেলেন অবলীলায়। ঘুন্নাক্ষরেও কারোর মাথায় আসলোনা এই বুদ্ধি। স্বপ্নে বি-ভোর abc - মনে মনে মুচকি মুচকি হাসি হাসছেন সকলের অগোচরে। তৃপ্ত এক পুরুষ - কম না হলেও দেড় থেকে দুই কোটি টাকা তার হাতের মুঠোয়। অবচেতন মনে জাল বুনতে লাগলেন কিভাবে উনি উনার ভবিস্যত গড়ে তুলবেন - চাকরী কে বিদায় দিয়ে টাকা গুলো গর্ত থেকে উঠিয়ে একদিন সকলের অজান্তে পগার পার হওয়ার সকল ফন্দিই এতে ফেলেছেন। 
ইতিমধ্যে কৈলাশ শহরে ই পি আর এর এই ৩ নঅম্বর উইং এর চার্লি কোম্পানিকে তাদের কেম্প করার আদেশ নিয়ে আসলেন সি অকুতভয় জাদরেল যোদ্ধা কমান্ডার মানিক চৌধুরী - ওনিই আবার কর্নেল রব ও কেপ্টেন দত্ত সাহেবদেরকে একত্রিত করলেন এবং যুদ্ধ বিগ্রহ শুরুর সকল অনুসান্গিকতা সম্পন্ন করছিলেন - ( যা শুনেছি ) . তারিখ বা মাস জানা নাই - কৈলাশ শহরে চলে গেলেন সবাই - চাতলাপুর বি ও পি তেও থেকে গেল একটা ই পি আর গ্রুপ - প্রসঙ্গত; বলতে হয় - এই চাতলাপুর বি ও পি পুরো নয় মাস ই ছিল একটা মুক্ত এলাকা। আব্দুল বাতেন চৌধুরী অনেক রিকোয়েস্ট করে থেকে গেলেন চাতলাপুর গ্রুপ এর সাথে। 
দলে দলে শরণার্থী উপচে পড়তে থাকলো ওই সকল আসে পাশের বর্ডার ওই পারের গ্রাম গুলোতে - হাজার হাজার মানুষ আসতে থাকলো - এই এক দলের সাথে মিলে ভেগে যাওয়ার পরিকল্পনায় নিমগ্ন - স্বপ্নে বিভোর আমাদের অতি প্রিয় আব্দুল বাতেন চৌধুরী ওরফে এ বি সি। 
দিন গড়িয়ে সপ্তাহ সপ্তাহ গড়িয়ে প্রায় মাস গড়াচ্ছে - হঠাত এক দিন আব্দুল বাতেন চৌধুরীর মাথায় হাত - কি বেপার - এত বেজার কেন উনি - 
পাঞ্জাবিদের থেকে নিয়ে নেওয়া ফিলিপস ছয় বেন্ডের রেডিওতে সন্ধার খবরে শুনতে পেলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের সকল পাচ শত টাকার নোট বাজিয়াপ্ত ঘোষণা করা হইলো। 
মুহুর্তের মধ্যে চুরমার হয়ে গেল উনার সকল স্বপ্ন - তাসের ঘরের মত নিমিষেই মিলিয়ে গেল অট্টালিকা। 
টাকা গুলো ঐ মাজারের গর্তের ভিতরেই এক দিন উইপোকার খাবারে পরিনিত হলো সেই দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। 
জীবনেও এই কথা উনি কাউকে বলেন নাই 
নিজের মনের দুঃখ নিজেই সহ্য করলেন একা একা। 
তারপর উনি আর যুদ্ধ ঠুদ্ধ করেন নাই। সবার অজান্তে সবার অগোচরে পালিয়ে গেলেন চাতলাপুর থেকে ; কেই জানতেন না উনি কোথায়। 
স্বাধীন বাংলাদেশ ; আমরা সবাই ফেরত এসেছি দেশে - আমি অনেক বড় হয়ে গেছি ইতিমধ্যে - ১৯৭৬ সাল একদিন আমাদের বাসয় এসে হাজির হাবিলদার মেজর আব্দুল বাতেন চৌধুরী ওরফে এ বি সি। 
গল্প বলার তার শেষ নাই - অনেক কথার পর জিগ্যেস করলাম - কোথায় গেলেন আপনি - আব্বা প্রায়ই বলতেন কোথায় যে হারালো বাতেন চৌধুরী টা ? 
তারপর আমাকে বললেন উনার টাকার সেই গল্প - 
অনেকক্ষণ পর প্রশ্ন করলাম তা আপনি কেনো বেকুফের মত ৫০০ টাকার নোট নিতে গেলেন ? কাকা 
অত্যন্ত বিজ্ঞতার সাথে বললেন ; ''বুজছেন নি কথাটা জি''
'' আমি তো মনে করছিলাম - ''
''কম পোজা বেশি ধন ''
Post a Comment