9 May 2015

STORY ABOUT OUR LIVES IN THE ARMY WRITTEN BY MY FRIEND MAJOR KABIR

সেতো অনেকদিন হয়ে গেলো! সব স্মৃতি মনেও নেই। আর আমি যেহেতু বরাবরই বিশিষ্ট ডজার টাইপের ছিলাম, তাই আমার রেজিমেন্টেশনেও এর ব্যাপক প্রভাব ছিলো। আমি যে কেমন ধরনের ডজার(ফাঁকিবাজ) ছিলাম তার উদাহরন-একাডেমীতে ED/ERC তে যেতে আমি কখনো কোম্পানী নোটিশ বোর্ড দেখতামনা। আমি নিশ্চিত জানতাম আমার নাম থাকবেই। আর ED/ERC 'র কারন হিসাবে remarks column এ লিখা থাকতো-Dodging on ED/ERC. আমাদের পাসিং আউটের সময় যে কোর্সের সবার ছবিসহ 'চির উন্নত মম শির' বের হয় তাতে আমাকে 'Sincere Dodger' উপাধি দেয়া হয়েছিলো।
আমি তাতে বিন্দুমাত্র মন খারাপ করিনি, কারন আমি জানি এটাই সত্যি।
এবার প্রসংগে ফিরি, ধান বানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে। আমি ফেরোশাস ফোরটীন পরিবারের গর্বিত সদস্য। ১৯৮৫ সালের ৩০শে মে আমি ইউনিটে জয়েন করি। আমার প্রথম এ্যাডজুটেন্টের কথা বলতে গেলে এখনো একটু বুক কেঁপে উঠে। নাম লে ইমরান, ৮ বিএমএ। ভাগ্য ভালো বগুড়া পৌছাতে বাস দেরী হয়েছিলো ফেরীতে, তাই ইউনিটে যখন পা রাখি তখন গভীর রাত। এস এম এনায়েত সাহেব আমাকে বাস স্টেশন থেকে রিসিভ করে সোজা এ্যাডজুটেন্টের অফিসে..হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করে করে লে ইমরান ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে ঘুমিয়েছিলেন। এস এম সাহেবের চেকের শব্দে চোখ খুলে তাকালেন। এস এম'র পাশে আমাকে দাঁড়ানো দেখে আন্দাজ করে নিলেন মুরগা হাজির। লম্বা ভ্রমনের জন্য আমি নিজেও ক্লান্ত। 'কাম ইন' যতটুকু সম্ভব গলার স্বর মোটা করে বললেন। বুঝে নিলাম এই আদেশ আমার জন্যই। রুমে ঢুকার পর কঠিন গলায় বললেন-what's your birth date? আমি নিচুস্বরে জবাব দিলাম-20th January sir. 'You were supposed to be born on 19th', বলেই গরম চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমার গলা শুকিয়ে এলো, কিন্তু তিনিতো আর আমার একাডেমীর খবর জানেননা, তাই ভরসা পেলাম। মনে সাহস এনে বললাম-may I have a glass of water sir? মুহূর্তেই তার মুখে রাগের বদলে বিস্ময় ভর করলো। আমার আপাদমস্তক তার দুচোখের চাহনিতে ঘেমে উঠলো। do I look like a mess waiter? তার প্রশ্ন আমার দিকে তাকিয়ে। আমি ভিতরে ভিতরে ভয়ে কাঁপলেও মুখে খুবই নিষ্পাপ ভাব এনে বললাম-sir you are very dark but tall and handsome. লে ইমরান আসলেও অনেক লম্বা. দেখতেও সুপুরুষ কিন্তু গায়ের রংটা একটু কম শ্যামলা(ইমরান স্যার, যদি আমার এই লিখা আপনার চোখে পরে, নিজ গুনে ক্ষমা করবেন)।
রাত গভীর হয়ে যাওয়ায় বা লে ইমরান নিজে সকালে প্যারেড নিতে হবে বিধায় আমাকে এস এম'র হাতে তুলে দিলেন। আমি একটু অবাক হলাম এই ভেবে যে ইউনিটে আসার আগে লে ইমরান সম্পর্কে যা শুনেছিলাম তাকেতো তেমন কঠিন মনে হলোনা। আমার ধারনাযে ভুল তা অবশ্য অল্পদিনেই বুঝে গিয়েছিলাম। রাতে এস এম সাহেব আমাকে ডি কোম্পানী লাইনে নিয়ে গেলেন।আমাকে রানার দেয়া হলো সিপাহী হাফিজ, সে অবশ্য বাস স্টেশনেও ছিলো। চৌকষ সৈনিক, তানাহলে সেই গভীর রাতে টেইলার ডেকে আমার মাপ নিয়ে সারারাত টেইলার রুমে বসে থেকে ভোরে দুই জোড়া ইউনিফর্ম নিয়ে আমি ঘুম থেকে জাগার আগেই নিজে তৈরি হতে পারতোনা। কাকতালীয় ব্যাপার হলো আমার প্রথম কোম্পানী কমান্ডারের নামও একই-মেজর হাফিজ (এসএসসি-৪)। পরদিন সকালে পিটি, আমাকে ১৫ মিনিট আগেই পৌছাতে হলো সিপাহী হাফিজের তাড়ায়, মনে হচ্ছিল আমি কোন কারনে দেরী হলে ওর চাকরি চলে যাবে। পিটিতে কোন অফিসারের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ হলোনা, তবে আড়চোখে তাকিয়ে পরিচিত মুখ দেখতে পেলাম, একাডেমীতে আমার মোস্তফা কোমপানির লে মমিন(৯ লং), লে বেনজীর(১০ লং), লে মারুফ ও লে খন্দকার ফারুক(১১ লং)। আমার আরেক কোর্সমেট মোজাফফর জয়েন করেছে রাতে কোন এক সময়, কিন্তু কোনভাবেই আমি তার সাথে দেখা করতে পারিনি। পিটিতে আমি তাকে খুঁজে হয়রান হয়ে গেলাম, কিন্তু পেলামনা। আমার মতো সেও কোন এক কোম্পানীর সৈনিকদের মাঝে দাডিয়ে হয়তো আমাকেও খুঁজছিলো তখন। সিও'র ইন্টারভিউর সময় দেখা হলো মোজাফফরের সাথে। সিও'র আগে আমার কোম্পানী কমান্ডার মেজর হাফিজের রুমে নেয়া হলো আমাকে। তাকে প্রথম দেখে একটু অবাকই হলাম। মাঝারি উচ্চতার এই মানুষটির চেহারায় একটি শিশুসুলভ ভাব আছে। দেখে মনে হচ্ছিল বয়স আমার চেয়ে বেশী নয়! ঠিকমতো গোঁফও উঠেনি। তার অফিসে অনেক কথা বললেন তিনি আমাকে, কিভাবে সেনাবাহিনীতে ভালো করা যায়, কোর্সগুলোতে কেন ভালো করতে হবে সবকিছুই। তিনি তখনো অবিবাহিত, তাই পরোক্ষ হুমকিও দিলেন যে আমার মধ্যে কোন উল্টাপাল্টা দেখলে সেটা হ্যান্ডেল করার জন্য তার সময়ের কোন আভাব হবেনা। সিও'র ইনটারভিউতে তেমন ভয় পাবার মতো কিছু ছিলোনা। প্রথম অধিনায়ক লে কর্নেল আনোয়ারুল হককে দেখে মনে হয়েছিলো-উনি এখানে কেনো? উনারতো এফ ডিসি তে থাকার কথা। খুবই সুপুরুষ, ফর্সা, লম্বা এবং পরে বুঝতে পেরেছি একজন ভালো মনের মানুষ ও চৌকষ অফিসার। 
আমাদের সবার রেজিমেন্টেশনের অভিজ্ঞতা কমবেশী একইরকম। সেই ভূয়া মেডিক্যাল টেস্ট, টাকা নিয়ে পিস্তল কেনা। তবে আমি আমার সেই ৮ সপ্তাহ সময়টুকু সত্যিই উপভোগ করেছি। আমার টুআইসি মেজর শামস(পরে লে কর্নেল), কিউ এম লে আইয়ুব(পরে লে কর্নেল) সবার এতো উপদেশ আর সহযোগীতা পেয়েছি যে জীবনের এই অধ্যায়ে এসেও তা মেনে চলার চেষ্টা করি।

একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করছি। জয়েন করার তৃতীয় দিন আমার আর মোজাফফরের পিইটি হবে। আমার রানার হাফিজ এফ এস এম ও রং করে সুন্দর করে রুমের আলমারির সাথে ঝুলিয়ে রেখেছে। আমার যা দেখভাল সবই আমার সিএইচ এম বকতিয়ারের এখতিয়ারে ছিলো। অসাধারন এক সৈনিক, মুক্তিযাদ্ধা আর হকিটিমের ব্যাক। মোজাফফরের রানার ছিলো সিপাহী সাইদ। সাইদ আমার কাছ থেকে মোজাফফরের জন্য সিগারেট নিতে এসে আমার রং করা এফএসএমও দেখে যায়। কিছুক্ষন পর হন্তদন্ত হয়ে মোজাফফর আমার রুমে এসে হাজির। তার চেহারায় খুবই দুশ্তিন্তার ছাপ। আমার পাশে বসে বললো-দোস্ত সকালে পিইটি ঠিক আছে, কিন্তু আমার চামড়া পরিস্কার করতে হবে কেন? আমি কিছু না বুঝতে পেরে কি ঘটনা জানতে চাইলাম। মোজাফফর বললো-'আমার রানার সিগারেট নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলে যে, স্যার কাল পিটেস্ট, কবীর সাহেবের চামড়া দেখলাম তার রানার পরিস্কার কইরা রাখছে, আপনেরটাও করন লাগবে। না হইলে এ্যাডজুটেন্ট ইমরান সাব রগডাইবো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম-চামড়া পরিস্কার করবো কিভাবে? রানার বললো-পিতল পালিশ দিয়া স্যার। আমি চিন্তা করে দেখলাম তোর গায়ের রং আমার থেকে একটু ফরসা, কিন্তু পিইটির জন্য চামড়া পরিস্কার করতে হবে কেনো? এইটা কেমন কথা? মোজাফফরের কথা শুনে আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম, কিন্তু ভেবে পেলামনা আমার রানার আমার চামড়া পরিস্কার করলো কখন? আমি নিজেইতো সাবান দিয়ে গোসল করেছি সেই সন্ধায়! আমার রানারকে রুমে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম-তুমি চামড়া পরিস্কার করলা কখন? 'আপনার সামনেই করলাম গেমসে যাওয়ার আগে। তারপর রৌদে দিলাম শুকাইতে।' আমি জোড়ে হেসে উঠলাম ওর কথা শুনে। মোজাফফর তখনো বিস্ময় চোখে তাকিয়ে, আমার হাসি দেখে আরো বেশী কনফিউজড। আমি আমার এফএসএমও দেখিয়ে বললাম, ওটাই চামড়া। সেদিন কিন্তু আমিও প্রথম চামড়ার সাথে পরিচিত হই।
আরো কিছু মজার স্মৃতি আছে আমার সেসময়ের, সুযোগ পেলে শেয়ার করবো।
সবার জন্য শুভেচ্ছা।

আমি যে সেনাবাহিনীতে ছিলাম
উপরের লিখাটা দেখে অনেকেই হয়তো চমকে উঠেছেন। ভাবছেন আমি মোগল কিংবা বৃটিশ বাহিনীতে ছিলাম কিনা? আমি আমার এই অতি প্রিয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কথাই বলছি। দিন কি বদলে গেছে অনেক? সময় কি অনেক পেরিয়ে গেছে? বুঝতে পারিনা নিজেই, তাই কনফিউশন বাড়ছেই আমার।
লিখতে চাচ্ছি খুব হাল্কা কিছু নিয়ে, শুরুটাই ভারী হয়ে গেলো। যাক্ যা বলতে চাই তা বরং বলা শুরু করি। আমার কোম্পানীর হাবিলদার মেজর ছিলো বকতিয়ার। হকি টিমের দূর্ধর্ষ ব্যাক, বীর মুক্তিযাদ্ধা। কিন্তু বকলম, কিভাবে সে পদোন্নতি পরীক্ষাগুলিতে পাশ করে হাবিলদার হলো, সেটা সবার প্রশ্ন। আমি তখন রেজিমেন্টেশনে, আমার রানার হাফিজের কাছে আমি ইউনিটের সবার গল্প শুনি। বকতিয়ারের লেখাপড়া না জানার বিষয়টা আমাকে অবাক করেছিলো খুব বেশী, কারন আমি সবসময় দেখেছি ওর হাতে একটা ডায়রী আর সে সেটা প্রায়ই খুলে পড়ে। আমি একদিন সৈনিক লাইনে দুপুরে খেতে বসেছি, বকতিয়ার আমার পাশে দাডিয়ে আমাকে বিকালে কিকি আদেশ তা শুনাচ্ছে, হাতে তার ডায়রী খোলা। ২০ জন গেমসে, ১৫ জন ওয়ার্কিং আর বাকিরা ওয়েপন ক্লিনিং করবে। বকতিয়ার লেখাপড়া জানেনা আমার মাথায় এটা কিছুতেই আসেনা। আমি খাওয়া শেষে বকতিয়ারের কাছে ওর ডায়রীটা চাইলাম। প্রথমে সে দিতে চাইলোনা, কিন্তু আমার চাপাচাপিতে দিতেই হলো। ডায়রী খুলে আমি অবাক। কোথাও কোন অক্ষর নেই, পাতায় পাতায় শুধু বিন্দু আর পাশে কোথাও কাঁচি, ফুটবল, পিস্তল বা অন্যকিছুর ছবি আঁকা। বিন্দু দিয়ে সে কতোজন সৈনিক আর ছবি দিয়ে কোনকাজ বুঝাতো। কি যে অবাক হয়েছিলাম সেদিন! পরে ওকে যখন আমার সরাসরি কমান্ডে পেলাম তখন বুঝতে পেরেছিলাম কেন আমার সিনিয়র অফিসারগণ পড়ালেখা না জানা সত্বেও ওকে হাবিলদার বানিয়েছিলেন। পদোন্নতি বোর্ডকে পরবর্তীতে প্ররোচিত করে বকতিয়ারকে আমরা নায়েব সুবেদার পদে পদোন্নতি দিয়েছিলাম।
রেজিমেন্টেশন শেষে মেসে গিয়ে আমার প্রথম মনে হলো, এ কোথায় এলাম? আমার সৈনিক লাইনের আবাস এর চেয়ে অনেক ভালো ছিলো। একরুমে আমরা তিনজন! দুজন আমার সিনিয়র, লে বেনজীর ও লে ফারুক। আমি এক অনাহূত সেরুমে। সকালে দুই ঘন্টা আগে আমাকে উঠতে হয়, নিজের বাথরুমের কাজ সেরে লে ফারুককে ডেকে দিতে হয়। রুমে সিনিয়র বলে সবার শেষে লে বেনজীর। ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিন ভেউ ভেউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করে।লজ্জায় কাঁদতে পারিনা। পিটি'র পরে রুমে ফিরে আবার উল্টা সিস্টেম, আমি সবার পরে গোসলের সুযোগ পাই। প্রায়দিনই নাসতা করার সুযোগ হয়না আমার। দ্বিতীয় পিরিয়ডে লেট হলে টুআইসি মেজর শামসের লিখিত ব্যাখ্যা দাবী অবধারিত। আমার মতো বিশ্ব ডজার প্রায় সিনসিয়রের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেললাম।
আর আমার প্রথম এ্যাডজুটেন্ট লে ইমরানকে তো কোনকিছু বলার প্রয়োজনই হতোনা। তার চোখের চাহনি যথেষ্ট ছিলো আমার জন্য। একদিন বিকেলে গেমসে আমার ফুটবল টীমের সাথে প্রাকটিসে থাকার কথা, পায়ে ব্যথা থাকায় আমি বসেছিলাম মাঠে। আমাকে ডেকে নিয়ে উনি আমাকে যা বল্লেন তা শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলামনা। ইমরান স্যারকে যারা একাডেমীতে পেয়েছেন, তারা তার ইংরেজী ঝাড়ি সম্পর্কে জানেন আশাকরি। অনেকক্ষন আমার জ্ঞানের পরিধির বাইরের ইংরেজীতে বললেন তিনি, বেশীরভাগ অর্থই আমি বুঝতে পারিনি(ইমরান স্যার এখনো তেমন দূর্বোধ্য ইংরেজী শব্দই বেশী ব্যবহার করেন)। শেষে উপসংহারে যা বললেন, বাংলা করলে দাঁড়ায়, 'বেশী পাইক্কোনা, এক্কেরে চিইপ্পা হাড্ডি মাংস ছেইচ্চালামু।' নিজের ক্ষমতার প্রকাশে বিশেষ এক অংগের প্রতি ইংগিত দিয়ে ফাইনাল ঝাড়িটা হলো, 'if I erect it, you can practice beam on it. If I put it in your shoulder, you will be divided into two pieces.'
এসবই এখন স্মৃতি। এরপর কতোযে আনন্দ আর সুখের দিন কেটেছে ইউনিটে! গেমসের পর মেসের বারান্দায় কেউ চেয়ারে, কেউ ফ্লোরে বসে আড্ডা মেরে রাত দশটা/এগারোটা বেজে গেছে, কারো খেয়ালই থাকেনি। লে আইয়ুব, ইমরান, মমিন, বেনজীর, মারুফ, ফারুক, মোজাফফর, আমি......
হায়রে আমার নানা রংয়ের দিনগুলি...
Post a Comment